পৃষ্ঠাসমূহ

সোমবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৩

জাগো বাঙালি জাগো

পৃথিবীর ইতিহাস নির্দিষ্ট কিছু সভ্যতার ইতিহাস। রোমান সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা, পারস্য সভ্যতা ইত্যাদি। ইতিহাস সাধারণত বিজয়ীর কথা বলে, বিজয়ীর পক্ষে কথা বলে। ফলে যেসব সভ্যতা অসংখ্য যুদ্ধ করেছে এবং বিজয়ী হয়েছে, ইতিহাস তাদেরই কথা বলে। একটা সময়ে ইউরোপীয় জলদস্যূরা পৃথিবীর বিভিন্ন সমৃদ্ধ ও শান্তিময় অঞ্চলে যাবার জলপথ আবিষ্কার করে। আবিষ্কারের পর এসব অঞ্চলে হানা দিয়ে চালাতে থাকে লুটতরাজ, এবং লুট করা ধনসম্পদ এনে বিক্রি করে ইউরোপের বাজারে। গোটা ইউরোপ এসব অঞ্চলে যাবার জন্য মুখিয়ে ওঠে। সবার থেকে এগিয়ে থাকে লোভী ইংরেজ আর ফরাসিরা। একসময় এসব সম্পদশালী দেশ ইউরোপীয় জলদস্যূ আর বেণিয়াদের দখলে চলে যায়। ইউরোপে দস্যূ আর বেণিয়াদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এইসময় এসব অঞ্চলের দখল নিয়ে বিভিন্ন ইউরোপীয়দের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ধূর্ত ইংরেজদের সাথে কেউ পেরে ওঠে না। ফলে একসময় গোটা পৃথিবী ইংরেজ বেণিয়াদের দখলে চলে যায়। শুরু হয় বৃটিশ সভ্যতা।
এসব তো জানা কথা। তবে কেন আমি এসব পুরাতন কথা বলছি? তাও এই একবিংশ শতাব্দিতে এসে? যখন পৃথিবী গ্লোবাল ভিলেজের কথা বলছে। বলছে গোটা পৃথিবী এক দেশ। তবে কেন? কেন আমাকে এইসব পুরাতন কাসুন্দি ঘাঁটতে হচ্ছে? প্রিয় পাঠক, আমার এই কেন’র উত্তর জানার আগে আরও কিছু উত্তর জানা খুব জরুরী বলে আমার মনে হয়।
গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ, আমাদের এই ভারতবর্ষ দুই শতাধিক বৎসর ইংরেজদের অধীন ছিলো। ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা এদেশের শাসকদের হাতে শাসনভার তুলে দিয়ে চলে যায়। আসলেই কি তারা চলে যায়? ইংরেজ শাসন কি এখনো ভারতবর্ষে নেই? তবে কেন প্রায় ৩০/৩৫ টি দেশের গুচ্ছভূমি আজ বহুধাবিভক্ত? কেন উপমহাদেশ বলে পরিচিত ভারত আজ একটি খণ্ডিত রাষ্ট্র? ১৯৪৭ এর ১৪ ও ১৫ আগস্ট ইংরেজরা পাকিস্তান ও ভারতকে কি সত্যিই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিল? আচ্ছা ইংরেজি শব্দ ডোমিনিয়ন-এর বাংলা অর্থ কী হয়? কেউ বলবেন কি? শিক্ষিত, ইংরেজি জানা মানুষের ভালো বলতে পারবেন। আরো ভালো বলতে পারবেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। আমরা না হয় এ প্রসঙ্গে আর নাইবা গেলাম।
এখন পৃথিবীতে কোন সভ্যতা রাজ করছে? এই প্রশ্নের উত্তরে সকলেই মুখে বিজয়ীর হাসি নিয়ে বলবেন, অ্যামেরিকান সভ্যতা। প্রিয় পাঠক, ঠিক বলেছি তো? কিন্তু আমি বলি, ইংরেজ সভ্যতার এখনো ইতি ঘটেনি। হ্যাঁ, স্বীকার করছি, পৃথিবী শাসন করছে অ্যামেরিকা। কিন্তু এই অ্যামেরিকা কোন অ্যামেরিকা? অ্যামেরিকা নামের যেভূখণ্ড আমরা জানি, সেখানকার অধিবাসীরা। এই যে অনেকেই বাঙালিকে সঙ্কর জাতি বলেন। ঠিক আছে মানলাম। বাঙালি সঙ্কর জাতি। কিন্তু ভাইসব, এটা তো অস্বীকার করবেন না, এই রক্ত আসলেই বাঙালি রক্ত। আমি যেমন গর্ব করে বলতে পারি, যতকিছুই ঘটুক, আমি বাঙালি। আমার মতো কোন অ্যামেরিকান জোর গলায় বলবে, হা, ‘আমিই অ্যামেরিকান’? সেই যোগ্যতাই যে তার নেই। কারণ, এখন যে অ্যামেরিকান বসতি। সেটা তো তৈরিই করেছে ইউরোপীয়ানরা। এবং শেষপর্যন্ত বিজয়ী ইংরেজ বেণিয়ারা। তাহলে এই অ্যামেরিকাকে ইংরেজপুত্র বলতে দোষটা কোথায়? এখন বৃটিশ সরকারকে অ্যামেরিকানদের প্রভূভক্ত কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়। যারা এই তুলনা করেন, তাদের দিকে ইংরেজরা ধূর্ত হাসি দিয়ে মনে মনে বলে, ‘আরে আমি তো আমারই সেবা করছি’। প্রিয় পাঠক, বিভিন্ন মনিষী এবং মিডিয়ার বক্তব্য বলছে অ্যামেরিকার সকল কুকর্মে তাদের সহচর হিসেবে থাকে বৃটেন। কিন্তু আমি বলছি, প্রিয় পাঠক, অ্যামেরিকার প্রতি ইংরেজদের এই আচরণ পুত্রবাৎসল্য ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই মনে হয় না। কারণ, অ্যামেরিকার মূল অধিবাসীদের ধ্বংস করে দিয়ে এই বৃটিশরা অই ভূখণ্ডে নিজেদের সম্প্রসারণ করেছে। সেই সম্প্রসারিত বৃটেন আজ অ্যামেরিকা নামে বিশ্বশোষণ করছে। একটু খেয়াল করে দেখুন, বৃটিশ শোষণ আর অ্যামেরিকান শোষণের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কিনা। তাই যে যাই বলুক। আমি বলব, ১৬শত শতকে যাত্রা শুরু করা বৃটিশ সভ্যতা আজও বহাল তবিয়তে টিকে আছে। এবং আমি দ্বিধাহীন বলছি, এই সভ্যতা অন্য সব সভ্যতার চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুর, এই সভ্যতা লুটেরার সভ্যতা।
আমার এতসব বক্তব্যের মূল কারণ কিন্তু অ্যামেরিকা নয়। মূলটা বাংলা নিয়ে, ভারতবর্ষ নিয়ে। এই ভারতবর্ষে ইংরেজযুগের সূচনা হয় তো বাংলা দখল করেই। সেই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটল। মীরজাফর নবাব হয়ে শাসন-শোষণের ভার তুলে দিল ইংরেজদের হাতে। সেই থেকেই যাত্রা শুরু। একে একে গোটা ভারতবর্ষ। এরপর শত বর্ষ পরে সিপাহীরা বিদ্রোহ করল। যাই ঘটুক না কেন, একটা বিদ্রোহ হয়েছিল। এরপর অসংখ্য বিপ্লব সংঘটিত হতে লাগল। সবই বিচ্ছিন্নভাবে। অসংগঠিত। মাস্টার দা সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম বসু, চন্দ্রশেখর আজাদ, এমন অসংখ্য বিপ্লবী ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বিপ্লবের আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই আগুন দাবানল হতে পারল না আজো। কেন পারল না? প্রিয় পাঠক, এমনিতে কথা কম বলি, কিন্তু যখন বলি, মুখ দিয়ে অপ্রিয় কথাই শুধু বের হয়। দয়া করে ক্ষমা করবেন আমাকে। আমার পূর্বপুরুষেরা যে আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করেছিলেন, সেটা তো প্রতিমুহুর্তেই দহন করছে আমাকে। তাই অপ্রিয় ছাড়া সুধাবর্ষণকারী কথা কই কীভাবে?
ইংরেজরা গোটা ভারতবর্ষে তাদের দখল সম্পন্ন করেই নজর দেয় চিরস্থায়ী শোষণ পরিকল্পনায়। সেই পরিকল্পনামতো এই অঞ্চলের মানুষকে তাদের তৈরি করা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত করতে শুরু করে। আর এর সাথে এ অঞ্চলের সরল মানুষের মনে রোপন করতে থাকে হিংসার বীজ। যে ভারতবর্ষ সাম্প্রদায়িকসম্প্রীতির এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেই ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়। ইংরেজরা এ অঞ্চলের জন্য, শুধু এ অঞ্চল না, তাদের অধিকৃত অঞ্চলের জন্য যে শিক্ষাপদ্ধতি প্রণয়ন করে সেটা তো খোদ বৃটেন থেকে তুলে না নয়। এই শিক্ষাব্যবস্থার ফলে তাদের অধিকৃত অঞ্চলের মানুষগুলো চিরদিনের জন্য বংশ পরম্পরায় তাদের অধীন হয়ে গেল। ইংরেজদের প্রণীত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েই ভারতীয়রা ভারতীয় বিপ্লবীদের বিরোধীতা করল। ধীরে ধীরে যে রাজনীতিক পরিবেশ গড়ে উঠল, সেটাও তো ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ার না। যে রাজনীতিক চর্চা আজও চলছে এই অঞ্চলে, সেটা তো বৃটিশদেরই তৈরি করা। যে শাসনব্যবস্থা, সেটা কি নতুন করে তৈরি করা? নাকি বৃটিশদের শেখানো শাসনব্যবস্থা? শুধু রাজনীতিতেই নয়, অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য সকল ক্ষেত্রে আমরা ইংরেজদের তৈরি করা ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে চলেছি। ওরা একটা চক্র তৈরি করেছে। আমরা সেই চক্রের ভেতর নিষ্পেষিত হচ্ছি আর ভাবছি, এই বেশ ভালো আছি।
এখন ইংরেজি না জানলে, ইংরেজি বলতে না পারলে শিক্ষিত হয় না। কেন? ইউরোপীয়রা এ অঞ্চলে আসার আগে কি ভারতবর্ষের মানুষ শিক্ষিত ছিল না? তাহলে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত সহ অসংখ্য আবিষ্কার এ অঞ্চলে হলো কীভাবে? ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষেরা কথায় কথায় প্লেটো, সক্রেটিস, মার্কস সহ নানা ইউরোপীয় পণ্ডিতের কথা বলেন। নিজেদের মধ্যেই যে অনেক পণ্ডিত আছে, সে খবর কী তারা রাখেন? হয়তো রাখেন না। আর রাখলেও, মানতে চান না। তাই তো নিজেকে অস্বীকার করে নাস্তিক্যবাদের উত্থান ঘটে। প্রিয় পাঠক, এখানে আমি শুধু এটুকুই বলবো, এই ইংরেজরা তাদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আমাদেরকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আজ আমরা আর মানুষ না। দাস, শুধুই দাস। যতই বই পড়ি, যতই ডিগ্রি অর্জন করি সবকিছু শেষে আমরা দাস। এরা আর একটা ব্যাপার খুব সুন্দরভাবে করে গেছে। মীরজাফরের ক্রমান্বয় ক্লোন তৈরি হওয়ার ব্যবস্থা করে গেছে। তাই তো আড়াইশত বছরের বেশি সময় পরও আমার সামনে মীরজাফরের নতুন চেহারা দেখি।
প্রিয় পাঠক, যদি সত্যিকার অর্থেই মুক্তি চাও। যদি বাঁচতে চাও নিজের মতো করে। যদি নিজেকে খূঁজে পেতে চাও। যদি আনন্দ চাও। তাহলে বলবো এই শিকল ছেঁড়ার ব্যবস্থা করো। ইংরেজদের শোষণচক্রে আর কতকাল নিষ্পেষিত হবে? জাগো, জাগো, জাগো. . .
Dhaka, Bangladesh
3 September 2013

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন